
ঢাকা শহরে এই মুহূর্তে যত ধরনের সমস্যা রয়েছে তার মধ্যে যানজট সমস্যা অন্যতম। স্কুল, কলেজ, বিশ^বিদ্যালয়, অফিস আদালত দাওয়াত যেখানেই যেতে চান না কেন- কমপক্ষে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা আগে আমাদের ঘর থেকে বের হতে হয়। নতুবা সঠিক সময়ে নির্ধারিত স্থানে পৌঁছানো যেন স্বপ্ন। এ সমস্যা আজকাল ধরে চলছে, তা নয়। চলছে ১৬/১৭ বছর ধরে। ঢাকা শহরের মানুষের কাছে যানজট আজ যেন এক আতঙ্কের নাম।
রাস্তায় যানবাহনেই মানুষের চলে যাচ্ছে দিনের বেশিরভাগ সময়। যে কাজে বের হচ্ছেন তাতে যতটা সময় খরচ করতে হচ্ছে তার চেয়ে বেশি সময় আমাদের রাস্তায় যানবাহনে কাটাতে হচ্ছে। যানজটে পড়লে গুরুতর রোগীদের জান বেরিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। এক কথায়, মেগাসিটি ঢাকাকে করুন করেছে যানজট।
বর্তমানে যানজটের কারণে জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় তিনগুণ। সে জ্বালানি দিয়ে দেশের অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উৎপাদন করে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা হয়তো সম্ভব হতো। পরিসংখ্যান মতে, যানজটে বছরে অন্তত ৪০ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়।
যানজটের প্রধান কারণসমূহ
১. অতিরিক্ত প্রাইভেট কার। রাস্তার যানবাহনের প্রায় ৮০ শতাংশ জুড়ে থাকে প্রাইভেট কার। অনেক পরিবারের তিন-চারটি করে প্রাইভেট কার রয়েছে। পত্রিকা থেকে জানা যায়, রাজধানীর মোট রাস্তার ৫৪.২ শতাংশ জায়গা দখলে রাখে প্রাইভেট কার।
২. সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনার ত্রুটি যানজটের অন্যতম কারণ। একটি মেগাসিটিতে শহরের আয়তনের ২৫ শতাংশ রাস্তা থাকতে হয়। কিন্তু ঢাকায় আছে মাত্র ৮ শতাংশ। এ রাস্তার অনেক জায়গা আবার বিভিন্ন অবৈধ দখলদারের হাতে।
৩. ফুটপাতে দোকান, যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং, মাঝ রাস্তায় বাস থামিয়ে যাত্রী উঠিয়ে রাস্তাকে সংকীর্ণ থেকে আরও সংকীর্ণতর করে ফেলা হচ্ছে।
৪. ঢাকার রাস্তায় মন্থর এবং দ্রুতগতির যান চলাচল করে, অর্থাৎ রিকশা, ঠেলাগাড়ি, অটো রিকশা, সিএনজি, প্রাইভেট, মোটরগাড়ি বাস হোন্ডা চলে। পৃথিবীর কোথাও এরকম জগাখিচুড়ি অবস্থা নেই।
৫. ঢাকায় যানজটের প্রধান কারণ যথাযথ নগর পরিচালন ব্যবস্থা না থাকা।
ডেসকো হয়েছে। এগুলোর কাজ এককভাবে দেখার কেউ নেই। ওয়াসা একবার রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি করে লাইন লাগায় তার ছয় মাস পর আবার ডেসকো রাস্তা খুড়ে নতুন লাইন করে। ফলে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি পুরো বছর জুড়ে চলে। ফলে অস্বাভাবিক যানজটের সৃষ্টি হয়।
৬. প্রতিদিন ঢাকার রাস্তায় নামছে প্রায় ২০০ বিভিন্ন ধরনের নতুন পরিবহন।
৭. যানজটের জন্য মাত্রাতিরিক্ত অভিবাসনও দায়ী। দেশের প্রতিটি এলাকা থেকে রাজধানীতে প্রতিদিন মানুষ আসে কাজের খোঁজে। ঢাকা পুরোপুরি অর্থনীতিনির্ভর শহর হয়ে গেছে।
সমাধান
৭০ শতাংশ যাত্রীকে বাসসেবার আওতায় আনতে হবে।
২. প্রাইভেট কারের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
৩. চৌরাস্তাগুলোতে টানেল নির্মাণ।
৪. ছোট ছোট বিকল্প রাস্তা তৈরি করতে হবে।
৫. ফুটপাতসহ সব রাস্তা দখলমুক্ত করতে হবে।
৬. ঢাকামুখী জনস্রোত অবিলম্বে বন্ধ করা। এজন্য নাগরিকদের ঢাকার বাইরে নানা সুবিধা তথা উন্নত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা দিতে হবে।
৭. শহরে সড়কপথের পাশাপাশি বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা (শহরের মধ্যে বা পাশে খাল বা দীর্ঘ লেক) থাকলে সড়কে চাপ পড়ে কম। হাতিরঝিলে তা করা কিছুটা সম্ভব হয়েছে। এক্ষেত্রে আমরা থাইল্যান্ডের ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সিস্টেমকে ফলো করতে পারি।
৮. ট্রাফিক পুলিশের সংখ্যা বাড়ানো।
৯. জনগণকে ট্রাফিক আইন মানতে উৎসাহিত করা।
১০. ঢাকার মেট্রোগুলো সম্পূর্ণ চালু করতে হবে।
১১. ঢাকায় এখন যেসব আন্ডারপাস আছে সেসব দিয়ে কোনো নাগরিক যেতে আগ্রহী না। কারণ যাতায়াতের পরিবেশ সেখানে নেই। তাই নতুন ব্যবহার উপযোগী আন্ডারপাসের ব্যবস্থা করতে হবে।
১২. প্রশাসন ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে।
১৩. যানজট নিরসনের লক্ষ্যে সরকারের আশু করণীয় হচ্ছে ছোট ছোট মিনিবাস তুলে দিয়ে দোতলা বাস চালু করা।
১৪. মূল সড়ক থেকে রিকশা/মন্থরগতির বাহন সম্পূর্ণ তুলে দেওয়া।
১৫. বর্ধিত ঢাকার সঙ্গে মূল ঢাকায় চলাচলের জন্য অধিকসংখ্যক বাইপাস সড়ক নির্মাণ।
১৬. রাস্তাগুলো দখলমুক্ত করা।
দেখা যায়, বিভিন্ন সরকারের আমলে শহরে যানজট নিরসনে নানা উদ্যোগ নিয়েও সফল করা যায় না নানা স্বার্থান্বেষী মহলের চাপে। তাহলে স্বার্থান্বেষী মহলের জন্য ঢাকাবাসী কি কখনোই এর সুফল হাতে পাবে না? যত দিন যাবে তত ঢাকার জনসংখ্যা বাড়তেই থাকবে। তাহলে কি ঢাকাবাসীর এ যন্ত্রণা আজীবন বয়ে বেড়াতেই হবে?
এক সময় ঢাকার চেয়ে কলকাতায় যানজট বেশি ছিল। সেই কলকাতা এখন যানজটকে বাগে এনেছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর বেশিরভাগ জনগণ পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করে। তাহলে আমরা করি না কেন? প্রাইভেট কারের সংখ্যা কমালে, একেকদিন একেক সংখ্যার প্রাইভেট কার (যেটা সিঙ্গাপুরে করা হয়) রাস্তায় নামালে ক্ষতি কি?
বিভিন্ন সময় বিশিষ্টজনেরা যানজট নিরসনে সুপরিকল্পিত নানান সাজেশন দিচ্ছেন। এখন সময় সেসব সাজেশন বাস্তবায়িত করা। সাজেশনগুলো কাগজ-কলমে থাকলে কোনো লাভ নেই।
ঢাকার মানুষকে যানজটের ভয়াবহতা থেকে বাঁচানো এখন সময়ের দাবি। ঢাকাবাসী কোনোমতেই অচল ঢাকা দেখতে চায় না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে এ দায়িত্ব নিতে হবে। ছাত্রসমাজ তাদের পাশে আছে। তাই যানজট দূরীকরণের সমস্যাগুলো সহজেই বাস্তবায়ন করা এখনই সম্ভব।
(সুত্রঃ আমাদেরসময়)



